মালদ্বীপ সংকটে কঠিন বিকল্পের মুখে চীন

পিএন২৪ ডেস্ক – ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের এক শীতল দিনে চীনের গ্রেট হলে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এক বিশেষ অতিথি মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন আবদুল গাইয়ুমকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ইয়ামিন তখন পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকারী এক নেতার সদম্ভ পদক্ষেপে রেড কার্পেটে হেঁটেছিলেন। এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে তার সরকার চীনের সঙ্গে ঐতিহাসিক একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে (এফটিএ) বিরোধীদের উপেক্ষা করে পার্লামেন্টের অনুমোদন নিয়েছিল।

ওই সফরে চুক্তিটি চূড়ান্ত স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল। অবশ্য কয়েক বছর ধরে মালদ্বীপের পররাষ্ট্রনীতি ধীরে ধীরে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট ছিল সেটি। ওই সফরে জিনপিং জোর দিয়ে ইয়ামিনকে ‘চীনের প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিস্তৃত বৃহৎ পরিবারের একজন সদস্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু ওই ঘটনার মাত্র দুই মাসের মাথায় দু’দেশের সম্পর্কের বন্ধন অপ্রত্যাশিত এক পরীক্ষার মাঝে পড়েছে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদসহ বিরোধী দলের ৯ জন নেতৃত্বস্থানীয় সদস্যের বিরুদ্ধে থাকা সন্ত্রাসবাদের একটি মামলা সুপ্রিমকোর্ট বাতিল করার পর ২০১৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মালদ্বীপে ১৫ দিনের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করেন প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন। এর কয়েক ঘণ্টার মাথায় নিরাপত্তা বাহিনী রাজধানী মালেতে ছড়িয়ে পড়ে এবং সুপ্রিমকোর্টের দু’জন বিচারপতিকে আটক করে। এছাড়া দেশটির সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুমসহ অনেক বিরোধীদলীয় নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।

এ বছরের শেষের দিকে মালদ্বীপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু দেশটি বর্তমানে একটি সাংবিধানিক সংকটে পড়েছে। এসব ঘটনার তরঙ্গায়িত প্রভাব গোটা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অনুভূত হচ্ছে এবং প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে ভারত ও চীনের কৌশলগত লড়াইকেও সেগুলো প্রভাবান্বিত করছে। এ দুটি দেশই অঞ্চলটিকে তাদের প্রভাব বিস্তারের ঐতিহ্যবাহী ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে ইয়ামিনের সিদ্ধান্তটি চীনের জন্য একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এসব বুঝতে হলে এ অঞ্চলে চীনের উদ্দেশ্য, স্বার্থ ও পদক্ষেপ পরীক্ষা করে দেখতে হবে। গত বছরের অক্টোবরে চীনের ১৯তম পার্টি কংগ্রেসের বক্তব্যে শি জিনপিং চীনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের একটি রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন, চীনের লক্ষ্য হচ্ছে ২০৫০ সালে বৈশ্বিক নেতৃত্ব দানকারীর মর্যাদা পাওয়ার আগে এশিয়ায় নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া।

চীনের ভাষায়- সমন্বিত জাতীয় শক্তি বিস্তৃতকরণ, নিজেদের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তিকে উপজীব্য করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে এবং নতুন আদর্শ তুলে ধরার পাশাপাশি বৈশ্বিক সুশাসনের বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিনিয়ত অধিকহারে কার্যকর ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে চায় বেইজিং। এটি এমন এক উচ্চাকাক্সক্ষী এজেন্ডা, যার জন্য প্রয়োজন কুশলী কূটনীতি- তুলনামূলক ছোট দেশ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মাধ্যমে সম্ভাব্য পাল্টা-ভারসাম্য আনার চেষ্টাকে প্রশমিত করা।

চীন-মালদ্বীপ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ মডেলের প্রয়োগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রকাশ পাচ্ছে। প্রথমত, যদিও মালদ্বীপের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বন্ধন আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭২ সালে স্থাপন করেছে চীন, কিন্তু দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্ক গভীর হওয়া শুরু হয়েছে ২০১১ সালে বেইজিং কর্তৃক মালেতে কূটনৈতিক মিশন স্থাপন করার মধ্য দিয়ে। তারপর থেকে এ সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে এবং প্রথম চীনা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জিনপিং ২০১৪ সালে মালদ্বীপ সফর করেন।

এরই মধ্যে চীন দ্বীপদেশটির জন্য বহু মিলিয়ন ডলার অনুদানের প্রতিশ্র“তি দিয়েছে। মালদ্বীপে বিদেশি পর্যটকদের এক-চতুর্থাংশই যায় চীন থেকে। মালদ্বীপের বিভিন্ন দ্বীপে অনেক মেগা অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চীনা কোম্পানিগুলো এবং দেশটি চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পের অংশীদার। ২০১৫ সালে মালদ্বীপের সংবিধানের এক সংশোধনীর মাধ্যমে বিদেশিদের ভূমির মালিকানার অধিকার দেয়া হয়। চীনকে উদ্দেশ্য করেই এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে মনে করা হয়। ওই সংশোধনীর পরই ২০১৭ সালে চীনের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করে মালদ্বীপ।

মালদ্বীপের জন্য চীন স্পষ্টতই একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার হয়ে পড়েছে; কিন্তু চীনের রাজকোষ এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশে এর বিনিয়োগের আকার বিবেচনায় নিলে সঠিক অর্থনৈতিক পরিভাষায় মালদ্বীপে বেইজিংয়ের বিনিয়োগ খুব বেশি কিছু নয়। অর্থনীতি বিশ্লেষণকারী সংস্থা মুডির মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মালদ্বীপে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ফলে অর্থনীতি এখানে চীনের মূল লক্ষ্য নয়; বরং এটি হচ্ছে কৌশলগত বিষয়, যার ওপর চীনা প্রেসিডেন্ট জোর দিচ্ছেন।

গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং বিদেশে চীনের সম্পত্তি রক্ষ

পালংনিউজ টুয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।